আমাদের সংবেদী অঙ্গ গুলোর মধ্যে চোখ অন্যতম ।দেখার যে স্বাদ সেটা আমরা চোখ দিয়ে বুঝি ।যে চোখে দেখে না সেই বোঝে চোখের মর্ম কি ? আজকে আমরা চোখ কেন কাঁপে সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করব । তাহলে চলুন জেনে নিই। আমরা অনেকেই এটা বিশ্বাস করি যে চোখের পাতা কাঁপা নাকি বিপদ আপদ এর লক্ষণ । অনেকেই বলে এটা নাকি কুসংস্কার। আমি 'মা ' য়ের কথাই বলছি । কোন বিপদ আসলে তার আগে আমার মায়ের চোখের পাতা কাঁপত । কিন্তু তারতো কোন শারীরিক সমস্যাও ছিল না । এক্ষেত্রে আপনারা এটাকে কি বলবেন। আমি এখনো দেখি কোন আগাম বিপদ আসার আগে চোখের পাতা কাঁপে । যাইহোক এটা আলোচনার বিষয় নয় । কথা প্রসঙ্গে বললাম যে এটা কুসংস্কার কিভাবে,আমার জানা নাই । বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বললাম । এখন দেখব চোখের পাতা কেন কাঁপে ? চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় চোখের পাতা কাঁপাকে মায়োকেমিয়া বলা হয় ।এটি সাধারণত চোখের নিচের পাতায় বেশি দেখা যায়, তবে উপরেও হতে পারে। অনেক সময় কয়েক সেকেন্ড থেকে শুরু করে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি কয়েক দিন বা সপ্তাহও চলতে পারে। একটি,দুটি নয় চোখের পাতা কাঁপার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। আমি এখানে শারীরিক কারণ গুলো ব্যাখ্যা করছি , ধর্মীয় ব্যাখ্যা আমার কাছে নাই । যে কারণ আছে তারমধ্যে -
![]() |
| চোখ |
১. চোখের শুষ্কতা : চোখের শুষ্কতা হল চোখে থাকা অশ্রুর পরিমাণ কম থাকাকে বুঝায় । মনে হয় বোঝেন নি । মানে হচ্ছে মানুষ যখন কাঁদে তখন তার চোখ বেয়ে পানি বের হয় । আর সেই পানি কম থাকাকে চোখের শুষ্কতা বলে । এর কি কারণ থাকতে পারে ? আর তা হল : এলার্জি,চোখের পাতা কম ফেলা ।
এক্ষেত্রে লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় : ঝাপসা দেখা ,চোখ লাল বর্ণ ধারণ করা , আলো সহ্য করতে না পারা ইত্যাদি।
২. অবসাদ কাটা : আপনি যদি অবসাদে সারা দিন কাটান । আর এভাবে যদি দীর্ঘ দিন ধরে চলে তবে ধরে রাখেন আপনার চোখের পাতা কাঁপবে ।
৩. ভিসন সিন্ড্রম : আমরা এমন অনেকেই আছি যারা দীর্ঘ ক্ষন ধরে মোবাইল,টিভি, কম্পিউটার অথবা অন্য কোথাও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি । আর কারণে চোখে চাপ পড়ে । ফলে চোখের পাতা কাঁপতে পারে ।তাই আপনার উচিত হবে চোখকে বিশ্রাম দেয়া ।
৪. পুষ্টির অভাব : পুষ্টির অভাবে চোখের পাতা কাঁপতে পারে । শুধু তাই নয় দেহে নিয়ন্ত্রিত ক্যালসিয়াম না থাকা , ভিটামিন 'ডি',ফসফেট পরিমাণে কম থাকা । এই কারণে চোখের পাতা কাঁপতে পারে ।
৫.নিদ্রার অভাব (Lack of Sleep)
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে চোখের স্নায়ু উত্তেজিত হয়, ফলে চোখ কাঁপতে পারে।
৬. মানসিক চাপ (Stress)
অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগ শরীরের বিভিন্ন পেশিকে প্রভাবিত করে, যার একটি হলো চোখের পাতা।
৭. ক্যাফেইন গ্রহণ (Excessive Caffeine)
চা, কফি বা এনার্জি ড্রিঙ্কে থাকা ক্যাফেইন স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে, ফলে চোখ কাঁপতে পারে।
৮. চোখ শুষ্কতা (Dry Eyes)
যাদের চোখে শুষ্কতা আছে বা যারা নিয়মিত লেন্স ব্যবহার করেন, তাদের চোখের পাতা কাঁপার প্রবণতা বেশি থাকে।
৯. অ্যালার্জি (Allergy)
চোখে অ্যালার্জি থাকলে চুলকানি বা জ্বালাভাবের কারণে ঘন ঘন চোখ কচলানো হয়, এতে পেশি উত্তেজিত হয়ে কাঁপতে পারে।
কখন চোখের পাতা কাঁপা বিপদের লক্ষণ হতে পারে?
যদিও সাধারণত চোখের পাতা কাঁপা ক্ষতিকর নয়, কিছু ক্ষেত্রে এটি নার্ভ বা নিউরোলজিক্যাল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। নিচে কিছু বিপজ্জনক লক্ষণ দেওয়া হলো যেগুলোর সঙ্গে চোখ কাঁপা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
১. চোখের কাঁপুনি দীর্ঘস্থায়ী হলে
যদি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চোখের পাতা কাঁপে, তাহলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
২. চোখ ফুলে যাওয়া বা লাল হওয়া
চোখ কাঁপার সঙ্গে যদি ফোলা বা লালচে ভাব দেখা দেয়, এটি চোখের সংক্রমণ বা প্রদাহের ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া
চোখ কাঁপার সঙ্গে যদি ঝাপসা দেখা, আলোতে অসুবিধা বা চোখে ব্যথা হয়, তাহলে এটি চোখের স্নায়ুজনিত সমস্যা হতে পারে।
৪. মুখের অন্য অংশ কাঁপা
যদি চোখের পাশাপাশি মুখের একপাশ বা ঠোঁটও কাঁপতে শুরু করে, এটি Hemifacial Spasm নামের স্নায়বিক রোগের লক্ষণ হতে পারে।
মুক্তির উপায়:
চোখের পাতা কাঁপা সাধারণত নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এটি কমানো যায়।
১.স্বাস্থ্যকর খাবার
ভিটামিন, খনিজ জাতীয় খাদ্য খেতে হবে ।প্রতিদিন ভিটামিন বি১২ ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন ডিম, কলা, বাদাম খান।
চর্বি ছাড়া মাংস খেতে হবে
২.ঘুম
প্রতিদিন অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম চোখের পেশিকে বিশ্রাম দেয়।
৩.স্ক্রিন টাইম কমানো
দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারে কাজ করলে মাঝেমাঝে চোখ বিশ্রাম দিন। প্রতি ২০ মিনিট পর পর ২০ সেকেন্ডের জন্য দূরে তাকিয়ে থাকুন।
৪,মানসিক চাপ কমানো
যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা নিজের কাজের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমান।
৫.ক্যাফেইন কমানো
চা, কফি বা কোলা জাতীয় পানীয় সীমিত করুন।
৬.চোখে ঠান্ডা পানি ছিটানো
চোখে ঠান্ডা পানি দিলে চোখের পেশি রিল্যাক্স হয় এবং কাঁপুনি কমে।
৭.মাদক বিশেষ করে অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে হবে
৮. ডাক্তার দেখাতে হবে।
কিছু ঘরোয়া উপায়
চোখে গোলাপজল বা ঠান্ডা তুলার প্যাড ব্যবহার করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন যাতে চোখ শুকিয়ে না যায়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ( FAQ)
১.চোখের পাতা কাঁপা কি চোখের স্নায়ুর সমস্যা?
উত্তর: সাধারণত না। তবে যদি চোখের কাঁপুনি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা মুখের অন্য অংশ কাঁপে, তাহলে এটি স্নায়বিক সমস্যা (neurological disorder) যেমন Hemifacial Spasm-এর লক্ষণ হতে পারে।
২.চোখের পাতা কাঁপা কি শিশুদের ক্ষেত্রেও হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, হতে পারে। সাধারণত চোখের ক্লান্তি বা ঘুমের অভাবের কারণে শিশুর চোখ কাঁপতে পারে, যা ক্ষতিকর নয়। তবে দীর্ঘদিন চললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩.ডান চোখের পাতা কাঁপা বা বাম চোখের পাতা কাঁপা কি আলাদা অর্থ বহন করে?
। এখানে আলাদা অর্থ বহণ বলতে এটি সম্পূর্ণ শারীরবৃত্তীয় বিষয়।
৪.চোখের পাতা কাঁপার সময় কি চোখের দৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
সাধারণত নয়। তবে যদি চোখের ব্যথা, ফোলা বা দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তা স্নায়ু বা কর্নিয়ার সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
