ক্যান্সার কী? লক্ষণ, কারণ ও প্রতিরোধ

সারা বিশ্বে এ যাবৎ কাল পর্যন্ত যত রোগ দেখা যায় তার মধ্যে ক্যান্সার একটি । বর্তমানে এটা নতুন কিছু নয় । যদিও অনেক ধরণ আছে । একেক ধরনের একেক বৈশিষ্ট্য । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর লাখো মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না হলে মৃত্যু ছাড়া উপায় নাই । আজকের এই লেখায় আমরা ক্যান্সার সম্পর্কে জানব । তো শুরু করা যাক 



Cancer, ক্যান্সার একটি ভয়াবহ রোগ
ক্যান্সার 


ক্যান্সার কী? (What is Cancer?)

ক্যান্সার‌ হল শরীরের এমন একটা অবস্থা যা‌ কোষ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এমনকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই অস্বাভাবিক কোষ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে (Metastasis), যা জীবন নাশের কারণ হতে পারে।





ক্যান্সার কত প্রকার (Types of Cancer))? 

আমরা সচরাচর ক্যান্সার এর কিছু নাম শুনেছি । ২০০ টিরও বেশি ক্যান্সার আছে । কতটির নাম আমরা জানি । তারপরও জানিয়ে রাখি । 

 


ব্রেস্ট ক্যান্সার


লিভার ক্যান্সার


প্রোস্টেট ক্যান্সার


ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia)


স্কিন ক্যান্সার


কোলন ক্যান্সার


এগুলো সচরাচর প্রচলিত ।


ক্যান্সার এর লক্ষণ গুলো কি কি ( Symptoms of Cancer) ?


 যে লক্ষণসমূহ দেখা দিলে আপনি বুঝবেন যে এই রোগটা ক্যান্সার হতে পারে -


হঠাৎ করেই ওজন কমে যাওয়া


শরীরে ব্যথা


গিলতে সমস্যা হওয়া


অস্বাভাবিক রক্তপাত


দেহের কোনো অংশে ফোলাভাব


 ক্লান্তি দীর্ঘমেয়াদী হিসেবে দেখা যেতে পারে 


ত্বকের রঙ পরিবর্তন হওয়া 


গলা ভাঙ্গা 

জ্বর


এছাড়াও আরোও লক্ষণ আছে । 




ক্যান্সারের কারণ কি ? ( Causes of Cancer)


মূলত কোন কারণে ক্যান্সার হয় তা এখনো না জানা গেলেও বেশি কিছু কারণ পাওয়া যায় ।তবে ক্যান্সার এর যে কারণগুলো আমারা জানি ।পাশাপাশি চমকে দেওয়ার মত কারণও থাকবে ।



১. জিনগত কারণ (Genetic Factors)

পরিবারের কারো যদি ক্যান্সার থাকে তাহলে তাহলে তার বংশ পরম্পরায় কারো ক্যান্সার এ্য ঝুঁকি থাকে । এটা সবাই বুঝে ।



২.জীবনযাত্রার সমস্যা (Lifestyle Factors)

ধূমপান : ক্যান্সার এর একটি প্রধান কারণ হিসেবে ধুমপান করা । ধুমপায়ীদের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুন বেশি 


অ্যালকোহল সেবন 

অ্যালকোহল বা মদ্যপান লিভার, ফুসফুস এর ঝুঁকি বাড়ায় 


খাবার- দাবার 

পান সুপারি, অতিরিক্ত লবণ এগুলো ক্যান্সার এর ঝুঁকি বাড়ায় । কি চমকে উঠলেন ? চমকে উঠার কথাই । পরেরটা দেখলে তো আরোও চমকে উঠবেন । বলছি মাংসের কথা । হ্যাঁ মাংস । মাংসও কিন্তু ক্যান্সার এর ঝুঁকি বাড়ায় । 


পরিশ্রম না করা 

যারা একেবারেই পরিশ্রম করেন না তাদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে । 



৩. পরিবেশগত কারণ (Environmental Exposure)


রেডিয়েশন


দূষণ


কেমিক্যাল এক্সপোজার


৪. বয়স 

 কি বয়সের কথা আসতেই চমকে উঠলেন ? হ্যাঁ , বয়স । বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে । কেন ? কারণ শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে। তবে ৭০% ক্যান্সার রোগী দেখা যায় ৬০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে। 



ক্যান্সার শনাক্তকরণ (Cancer Diagnosis)

রোগ নির্ণয়ে যেসব টেস্ট করা হয়—


CT Scan / MRI


Ultrasound


Blood Test


Biopsy


PET Scan


প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে রোগ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা অনেক গুন বেড়ে যায়।




ক্যান্সারের চিকিৎসা (Cancer Treatment) কি কি ?



১. কেমোথেরাপি (Chemotherapy)

ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এটা একটা পদ্ধতি । 


২. রেডিওথেরাপি (Radiotherapy)

ক্যান্সার এর আরও একটি চিকিৎসার নামে রেড়িওথেরাপি । উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেডিয়েশন দিয়ে ক্যান্সার কোষকে‌ ধ্বংস করে ফেলা হয়।


৩. সার্জারি (Surgery ) 

শরীরের যে অংশে ক্যান্সার হয় তা অপসারণ এর প্রয়োজনে হয় । 



৪. ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy)

রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (Immune System) শক্তিশালী করা হয়।



ক্যান্সার প্রতিরোধ (Cancer Prevention)

ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করুন


অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খান


নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা


শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা


ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম



ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচে? (How Long Does a Cancer Patient Live?)

ক্যান্সার হলে রোগী কতদিন বাঁচবে—এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। এটি নির্ভর করে—


ক্যান্সারের ধরন


কোন স্টেজে ধরা পড়েছে


রোগীর বয়স


অন্যান্য রোগ আছে কিনা


চিকিৎসা শুরু করতে কত দেরি হয়েছে


স্টেজ–১ বা স্টেজ–২ এ ধরা পড়লে অনেক রোগী দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন।

কিন্তু স্টেজ–৪ এ রোগ ছড়িয়ে পড়লে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হয়।



ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর লক্ষণ (Signs a Cancer Patient Is Near Death)

যখন ক্যান্সার একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন রোগীর শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে:


খাদ্যগ্রহণ কমে যাওয়া


বারবার ঘুমিয়ে পড়া


শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া


শ্বাস ঠিকমত নিতে না পারা


শরীরে পানি জমা


প্রস্রাব কমে যাওয়া


অধিক দুর্বলতা


এগুলো সাধারণত End-of-life Symptoms নামে পরিচিত।




আচ্ছা ক্যান্সার যদি কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় তাহলে ব্লাড ক্যান্সার কেন ক্যান্সার ‌? এটাতো কোষ না রক্ত 



প্রশ্নটি কিন্তু খুব ভালো — “যদি ক্যান্সার হয় কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, তাহলে ব্লাড ক্যান্সার কেন ক্যান্সার? রক্ত তো কোনো কোন নয় !”


এটি বোঝার জন্য ক্যান্সারের মূল ধারণাটি একটু গভীরভাবে বুঝতে হবে।


ক্যান্সার মানে শুধু টিউমার বা গুটি নয় – কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি


ক্যান্সার বলতে বোঝায়:


 যে কোনো কোষের অনিয়ন্ত্রিত (Uncontrolled) ও অস্বাভাবিক (Abnormal) বৃদ্ধি যা প্রথমেই বলেছি ।‌


এই বৃদ্ধি যদি শরীরের টিস্যু বা অঙ্গে হয়, তখন তা টিউমার তৈরি করতে পারে।

কিন্তু সব ক্যান্সার টিউমার তৈরি করে না।


❗ তাহলে ব্লাড ক্যান্সার কেন ক্যান্সার?

কারণ—


রক্তের মধ্যেও কোষ থাকে:


WBC (White Blood Cells)


RBC (Red Blood Cells)


Platelets


ব্লাড ক্যান্সার সাধারণত WBC-এর অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধি দিয়ে শুরু হয়।এগুলো কি করে?


হঠাৎ করে অতিরিক্ত সংখ্যায় বাড়তে থাকে


স্বাভাবিক রক্ত কণিকাগুলোকে কাজ করতে দেয় না


রক্ত তৈরি হওয়ার জায়গা (Bone Marrow) দখল করে নেয়


স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়


ফলে রক্তের মধ্যে অস্বাভাবিক, অকার্যকর কোষ ভরে যায়।


এটাই হলো ক্যান্সারের মতোই একধরনের অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধি—তাই একে ক্যান্সার বলা হয়।



“কিন্তু ব্লাড ক্যান্সারে তো গুটি হয় না?”

হ্যাঁ, সেটা ঠিক। এজন্য ব্লাড ক্যান্সারকে Non-Solid Cancer বলা হয়।


ক্যান্সার দুই ধরনের হতে পারে:


১. Solid Tumor (গুটি বা টিউমার হয়)

ব্রেস্ট ক্যান্সার


লিভার ক্যান্সার


লাং ক্যান্সার


২. Non-Solid Cancer (গুটি হয় না)

ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia)


লিম্ফোমা


মাইলোমা


Non-solid cancer–এ গুটি থাকে না, কিন্তু কোষের সংখ্যা এত দ্রুত ও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে যে শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়—এটাই ক্যান্সারের মূল কারণ।




FAQ (Frequently Asked Questions)



১. ক্যান্সার কি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য?

অনেক ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তবে কিছু ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু পুরোপুরি সারানো যায় না।


২. ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে?

না, ক্যান্সার ছোঁয়াচে নয়।


৩. ধূমপান ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটা বাড়ায়?

ধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৮০%।


৪. ক্যান্সার প্রতিরোধে কী খাওয়া উচিত?

অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার, শাকসবজি, ফল, বাদাম, ওমেগা–৩ সমৃদ্ধ খাবার।


৫. স্টেজ–৪ ক্যান্সার কি বেঁচে থাকা সম্ভব?

অনেক সময় স্টেজ–৪ ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, সম্পূর্ণ নিরাময়ের করা যায় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম