ছুলি (Tinea বা Ringworm) হলো এক ধরনের ছত্রাকজনিত চর্মরোগ। এটি শরীরের ত্বকে গোলাকার দাগ সৃষ্টি করে ।ছোট শিশু থেকে শুরু করে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের শরীরে ছুলি দেখা যায় । একে এক এক নামে ডাকা হয় । ছুলি ,ছইদ,ছৌদ,ছলম ইত্যাদি নামে ডাকা হয় । সমস্যাটি মূলত দেখা যায় মুখ, হাত,ঘাড়,পিঠ ইত্যাদি জায়গায় ।
![]() |
| ছুলিতে আক্রান্ত একজন লোকের প্রতীকী ছবি |
ছুলির লক্ষণ কি ?
ছুলির সাধারণ লক্ষণ
ত্বকে গোলাকার লালচে দাগ অথবা বলা যেতে পারে লাল ফুঁসকুড়ির মতো কিছু দেখতে পাওয়া ।
প্রচণ্ড চুলকানি
কখনও কখনও হালকা ব্যথা বা জ্বালাপোড়া অনুভূত হওয়া
সংক্রমণ বেশি হলে চামড়া উঠতে পারে
ছুলি হওয়ার কারণ কি ?
ছুলির প্রধান কারণ হচ্ছে ছত্রাক আক্রমণ।
অতিরিক্ত ঘাম ও অপরিষ্কার ত্বক
অন্যের তোয়ালে, কাপড় বা বিছানা ব্যবহার করা
ইমিউন সিস্টেম দুর্বল থাকা
ছুলি কখন হয় ?
কখন হয় তার কিছু কারণ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:-
১. গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া: গ্রীষ্মকালে গরম আবহাওয়ায় ছুলির আক্রমণ হতে দেখা যায় ।
২. ট্যাবলেট: এখানে ট্যাবলেট মূলত স্টেরয়েড ট্যাবলেটকে বুঝানো হয়েছে। আপনি যদি অনেক দিন যাবৎ সেবন করেন তাহলে আপনার ছুলি হবে ।
ছুলি থেকে মুক্তির উপায় কি ?
মুক্তির উপায়: নিচে কিছু ঘরোয়া উপায় নিয়ে আলোচনা করা হল :
১. টক দই
দই স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা আমরা সকলেই জানি । টক দইয়ে থাকা ল্যাক্টিক অ্যাসিড ছুলি দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। দিনে ৩-৪ বার কিছু টক দই নিয়ে কটন বারের সাহায্যে আক্রান্ত স্থানে লাগান । তারপর ১৫-২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।
২. টমেটোর রস
ছুলির দাগ কমাতে টমেটোর রস ব্যবহার করুন । টমেটোতে থাকা ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ছুলি নিরাময়ের জন্য এক বিশেষ উপাদান । একটি টমেটোর কাটা অংশ নিন । তারপর আক্রান্ত স্থানে আলতোভাবে মালিশ করুন । অবশ্যই ১৫-২০ মিনিট যাবৎ করতে হবে । তারপর ধুয়ে ফেলুন।প্রতিদিন দুইবার করে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত করতে হবে।
৩. লেবুর রস
ছুলি কমাতে লেবুর রস বেশ সহায়ক। লেবুতে থাকা বর্ধিত উপাদান ছুলি ,ত্বকের গায়ে দাগ দূর করতে সহায়তা করে।
৪. পেঁয়াজ
ছুলি নিরাময়ে পেঁয়াজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি পেঁয়াজকে কেটে নিয়ে একটা অংশ ছুলির দাগে ম্যাসাজ করুন। এটি দিনে দুইবার করুন । পেঁয়াজে থাকা এক্সফলিয়েটিভ উপাদান ছুলি নিরাময়ে বেশ সহায়ক।
৫. রসুনের রস
রসুনে থাকা অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান ছুলি নিরাময়ে খুব কার্যকর।
ব্যবহার:
একটি রসুন পিষে তার রস আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিন ১–২ বার ব্যবহার করুন।
৬.নিমপাতা
নিমের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণ ছুলি নিরাময়ে সহায়ক।
ব্যবহার:
নিমপাতা ফুটানো পানিতে স্নান করুন অথবা নিমপাতার পেস্ট আক্রান্ত স্থানে লাগান।
৭. পানি পান: নিয়মিত পানি পান করুন ।অন্তত ৫-৬ গ্লাস পানি পান করুন ।
ছুলি নিরাময়ের চিকিৎসা
যদি ঘরোয়া উপায়ে কাজ না হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসক সাধারণত রোগের অবস্থা অনুযায়ী ওষুধ দিয়ে থাকেন ।
👉 চিকিৎসা চলাকালীন ওষুধ সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্ধেক ব্যবহার করে বন্ধ করলে রোগ ফিরে আসতে পারে।
ছুলি প্রতিরোধে করণীয় কি ?
প্রতিদিন গোসল করুন এবং শরীর শুকিয়ে নিন
ব্যক্তিগত তোয়ালে, পোশাক, চিরুনি ইত্যাদি আলাদা ব্যবহার করুন
ঘাম হলে সঙ্গে সঙ্গে শুকিয়ে ফেলুন
গরমে ঢিলেঢালা ও হালকা পোশাক পরুন
বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও তোয়ালে নিয়মিত ধুয়ে শুকিয়ে ব্যবহার করুন
ছুলি দ্রুত সারানোর জন্য অতিরিক্ত টিপস
খাদ্যাভ্যাসে যত্ন: ভিটামিন সি, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন।
স্ট্রেস কমান: মানসিক চাপ ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করে ছত্রাক সংক্রমণ বাড়াতে পারে।
ঘুম ঠিক রাখুন: পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন ?
ঘরোয়া উপায়ে কাজ না করলে
ত্বকে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়লে
জ্বালা বা ব্যথা বাড়লে
চোখ, মাথা বা যৌনাঙ্গে ছুলি হলে
১. ছুলি কি শুধু গরমে হয়?
না। তবে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এর সংক্রমণ বেশি হয়। যেকোনো ঋতুতে হতে পারে, কিন্তু গরম এবং বর্ষাকালে এর প্রকোপ বাড়ে।
২. ছুলি কি সারাজীবনের জন্য চলে যেতে পারে?
সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা করলে এটি পুরোপুরি সেরে যায়, তবে আবারও সংক্রমণ হতে পারে যদি পরিচ্ছন্নতা না মানা হয়।
৩. ছুলি কি ত্বকের রঙ স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে দেয়?
না । অনেক সময় দাগের স্থান কিছুদিন গাঢ় বা ফ্যাকাশে হয়ে থাকে, তবে সময়ের সঙ্গে ত্বক স্বাভাবিক রঙে ফিরে আসে।
৪. শিশুর শরীরে ছুলি হলে কি বিপদজনক?
না, তবে শিশুদের ত্বক নরম হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাই দ্রুত চিকিৎসা জরুরি।
৫. ছুলি কি পানিতে স্নান করলে বাড়ে?
না, বরং প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করলে সংক্রমণ কমে। তবে ভেজা শরীরে কাপড় পরা যাবে না।
৬. ছুলি সারাতে কতদিন সময় লাগে?
সাধারণত হালকা সংক্রমণে ২–৪ সপ্তাহে সেরে যায়। গুরুতর হলে ৬–৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।আবার কয়েক মাস লাগতে পারে ।
ছুলি একটি সাধারণ কিন্তু বিরক্তিকর চর্মরোগ। এটি দ্রুত ছড়ায়, তবে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। ঘরোয়া উপায়ের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও প্রতিরোধমূলক অভ্যাস বজায় রাখাই ছুলি থেকে মুক্তির সর্বোত্তম উপায়।
