প্রস্রাব আটকে যাওয়া (Urinary Retention) এমন একটি অবস্থা যেখানে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হতে পারে না, বা কখনও কখনও একেবারেই প্রস্রাব বের হয় না। এটি পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি কিডনি পর্যন্ত ক্ষতি করতে পারে।
![]() |
| একটি প্রতিকী ছবি( প্রস্রাব আটকে যাওয়ার কারণ ও লক্ষণ ) |
প্রস্রাব আটকে যাওয়ার ধরন আছে কি ?
হ্যাঁ,প্রস্রাব আটকে যাওয়ার দুটি প্রধান ধরন আছে —
তীব্র বা আকস্মিক (Acute Urinary Retention):
এটি হঠাৎ ঘটে। রোগী প্রবল ব্যথা অনুভব করেন এবং প্রস্রাব করতে পারেন না। এটি একটি জরুরি অবস্থা এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
ধীরে ধীরে বা দীর্ঘমেয়াদি (Chronic Urinary Retention):
এই অবস্থায় মূত্রথলি আংশিকভাবে খালি হয়, কিন্তু সব মূত্র বের হয় না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূত্রথলি ফুলে যায়, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রস্রাব আটকে যাওয়ার কারণ কি ?
প্রস্রাব আটকে যাওয়ার কারণ বিভিন্ন হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো —
পুরুষদের ক্ষেত্রে
প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি (Benign Prostatic Hyperplasia - BPH)
বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণ। প্রোস্টেট বড় হয়ে মূত্রনালী চেপে ধরে, ফলে প্রস্রাব বের হতে কষ্ট হয়।
প্রোস্টেট ক্যান্সার বা ইনফেকশন।
নারীদের ক্ষেত্রে
মূত্রথলি নেমে যাওয়া (Cystocele) বা জরায়ু নেমে যাওয়া (Uterine Prolapse)।
প্রসবজনিত আঘাত বা সার্জারির পর স্নায়ুর ক্ষতি।
উভয়ের ক্ষেত্রেই সাধারণ কারণ
মূত্রনালিতে পাথর (Urinary Stones): মূত্রনালির যেকোনো স্থানে পাথর আটকে গেলে প্রস্রাবের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
সংক্রমণ (UTI)
তীব্র সংক্রমণ হলে মূত্রনালী ফুলে গিয়ে প্রবাহ ব্যাহত করে।
স্নায়ুর সমস্যা (Neurogenic Bladder)
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, ডায়াবেটিস বা স্ট্রোকের কারণে মূত্রথলি নিয়ন্ত্রণ হারায়।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ঔষধ বা ব্যথার ওষুধ স্নায়ু ও পেশীর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রস্রাব আটকে যাওয়ার লক্ষণ কি কি ?
প্রস্রাব শুরু করতে অসুবিধা হওয়া
মূত্র প্রবাহ ধীরে বা দুর্বল হওয়া
বারবার প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা
প্রস্রাব শেষে মনে হওয়া যে মূত্রথলি পুরো খালি হয়নি
তীব্র পেট ব্যথা ও নিচের পেট ফুলে ওঠা
রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা (Nocturia)
জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাবের সঙ্গে ব্যথা
কিভাবে নির্ণয় করা হয় ?
চিকিৎসক সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করতে পারেন:
শারীরিক পরীক্ষা
মূত্রথলি ফুলে আছে কিনা দেখা হয়।
আল্ট্রাসোনোগ্রাম (USG)
মূত্রথলিতে প্রস্রাব জমে আছে কিনা তা দেখা হয়।
ইউরোফ্লোমেট্রি টেস্ট
প্রস্রাবের প্রবাহ কতটা শক্তিশালী তা পরিমাপ করে।
রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা
সংক্রমণ বা কিডনি সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করা হয়।
সিস্টোস্কপি
একটি ছোট ক্যামেরা দিয়ে মূত্রনালী ও ব্লাডারের ভেতর দেখা হয়।
প্রস্রাব আটকে যাওয়ার চিকিৎসা কি ?
চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের উপর —
তীব্র প্রস্রাব আটকে গেলে
ক্যাথেটার ব্যবহার:
মূত্র বের করতে একটি টিউব (catheter) ঢোকানো হয়। এটি তাৎক্ষণিক আরাম দেয়।
ওষুধ:
ডাক্তার প্রোস্টেট ছোট করার বা মূত্রথলির পেশি শিথিল করার ওষুধ দিতে পারেন।
দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায়
প্রোস্টেটের চিকিৎসা:
BPH থাকলে ওষুধ বা প্রয়োজনে সার্জারি করা হয়।এটা ডাক্তারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ।
স্নায়ুজনিত সমস্যায়:
নির্দিষ্ট ওষুধ, ফিজিওথেরাপি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন সহায়তা করে।
প্রস্রাব আটকে গেলে ঘরোয়াভাবে কি করবেন ?
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন (২–৩ লিটার)।
প্রস্রাবের বেগ চেপে রাখবেন না।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা ক্যাফেইন গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।
দীর্ঘ সময় বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন।
প্রোস্টেট বা মূত্রনালির সমস্যা থাকলে বছরে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন ?
নিচের উপসর্গগুলোর মধ্যে যেকোনোটি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে —
হঠাৎ একেবারেই প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া
তীব্র পেট ব্যথা
জ্বর ও ঠান্ডা লাগা
প্রস্রাবে রক্ত দেখা
মূত্রথলি ফুলে ওঠা বা নিচের পেটে চাপ অনুভব করা
এগুলো জরুরি লক্ষণ। দেরি করলে কিডনি ড্যামেজ হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব আটকে যাওয়ার কারণ কী?
রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা প্রোস্টেট বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, বা মূত্রথলির পেশী দুর্বলতার কারণে হতে পারে। নিয়মিত পানি ও ওষুধের সময় ঠিক রাখুন।
২. বেশি পানি খেলে কি প্রস্রাব আটকে যায়?
না, বরং পর্যাপ্ত পানি না খেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে পাথর বা ইনফেকশন হতে পারে, যা পরবর্তীতে প্রস্রাব আটকে যাওয়ার কারণ হয়।
৩. প্রস্রাব আটকে গেলে ঘরোয়া উপায় কী হতে পারে?
তাৎক্ষণিক ঘরোয়া উপায় কার্যকর নয়। তবে সামান্য সমস্যা হলে গরম পানির সেঁক নিলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে। গুরুতর হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
৪. প্রস্রাব আটকে থাকলে কি কিডনি নষ্ট হতে পারে?
হ্যাঁ, দীর্ঘ সময় প্রস্রাব জমে থাকলে কিডনিতে চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে কিডনি বিকল হতে পারে।
৫. শিশুর প্রস্রাব আটকে গেলে কী করবেন?
শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মূলত চিকিৎসার বিষয়। প্রস্রাব বন্ধ থাকলে বা বারবার ব্যথা করলে সঙ্গে সঙ্গে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
শেষ কথা
প্রস্রাব আটকে যাওয়া কোনো তুচ্ছ সমস্যা নয়। এটি শরীরের ভেতরের বড় কোনো জটিলতার ইঙ্গিত হতে
পারে। তাই এমন সমস্যা দেখা দিলে লজ্জা বা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা পেলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
