আমরা সকলেই কমবেশি টনসিল নামটির সাথে পরিচিত । যার সমস্যা হয়েছে কিংবা হয়নি তা-ও আমরা এই নামটির সাথে পরিচিত । যেহেতু আমরা পরিচিত তথাপি এই পোস্টে এর বিশদ বিবরণ নিয়ে আলোচনা করা হবে। প্রথমেই জানব টনসিল কি ?
![]() |
| টনসিল নষ্ট হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ জেনে রাখুন – সময়মতো চিকিৎসা নিন। |
টনসিল(Tonsil)কি ?
গলা ও শ্বাসনালীর ভিতরে থাকা লিম্ফোয়েডকে টনসিল বলা হয় । কি কিছু বুঝলেন না লিম্ফোয়েড কি ? তাহলে সোজা কথায় বলি । গলার ভিতরে ডান ও বামদিকে ছোট বড় অংশের মত অংশকে টনসিল বলা হয় । এবার তো বুঝলেন টনসিল কি ?
টনসিলের প্রদাহ(Tonsillitis) কি ?
এখন জানাব টনসিলের প্রদাহ কি ? টনসিল কি সেটাতো বললাম। ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া যেটাই বলি না কেন এর যেকোন একটির আক্রমনে টনসিল ফুলে যাওয়াই টনসিলের প্রদাহ। আবার অন্যভাবে বললে,কখনও কখনও এই টনসিল নিজেই সংক্রমিত হয়ে ফুলে যায়, ব্যথা করে এবং খাওয়া-দাওয়া কষ্টকর করে তোলে। একে বলা হয় টনসিলাইটিস ।
টনসিল কি কাজ করে ?
রোগ, জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকে ।
টনসিল কীভাবে কাজ করে ?
টনসিল আমাদের শরীরে এক ধরনের প্রাকৃতিক ফিল্টারের মতো কাজ করে। এটি নাক ও মুখ দিয়ে প্রবেশ করা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে আটকায়, যাতে তারা শরীরে ছড়াতে না পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে টনসিল খুব সক্রিয় থাকে কারণ তখন তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি গঠিত হয়নি।
টনসিলের প্রদাহ কাদের বেশি হয় ?
টনসিল সাধারণত ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ,তবে সেটা গলার দু'পাশে।
লক্ষণ গুলো কি কি ?
লক্ষণ: যেহেতু এটা জীবাণুর আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে তথাপি এর কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায় । আর তা হল :
১. গলার লিম্ফগ্রন্থি ফুলে যায়,গলা ব্যথা
২. মাথা ব্যথা
৩. কান ব্যথা ,সেটা কি যন্ত্রণার ,বলার মত নয় ।
৪. খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া
৫. টনসিল হলুদ বা সাদা রং ধারণ করে
৬. জ্বর
৭. এমনকি মাড়িতে পর্যন্ত ব্যথা হতে পারে । ইত্যাদি
৮.গলায় জ্বালাপোড়া ও কণ্ঠ ভেঙে যাওয়া
৯.মুখে দুর্গন্ধ (Bad breath)
টনসিলের প্রদাহ বা টনসিলাইটিসের কারণ কি ?
টনসিল ফুলে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো সংক্রমণ। এটি সাধারণত দুইভাবে হতে পারে—
ভাইরাসজনিত সংক্রমণ (Viral Infection) – যেমন: ঠান্ডা লাগা বা ফ্লু ভাইরাস।
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ (Bacterial Infection) – যেমন: স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া।
অন্যান্য কারণগুলোও টনসিলের সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে—
ঠান্ডা পানি বা আইসক্রিম বেশি খাওয়া
দীর্ঘদিন গলায় ধুলো বা ধোঁয়া জমে থাকা
শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া
তৎক্ষণাৎ যা করবেন:
১. কুসুম গরম পানি দিয়ে গড়গড় করুন
২. গরম সেঁক দিন
৩. ঠান্ডা কোন কিছু নাড়াচাড়া করবেন না ।
৪.ধুলো, ধোঁয়া ও ঠান্ডা পরিবেশ থেকে দূরে থাকুন।
৫.দিনে একাধিকবার গরম পানি দিয়ে গার্গল করুন।
৬.মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
টনসিলের জটিলতা
চিকিৎসা না করালে টনসিলের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে নিচের সমস্যাগুলো হতে পারে—
গলা ও কান পর্যন্ত সংক্রমণ
ঘুমের সময় শ্বাসকষ্ট (Sleep apnea)
দীর্ঘমেয়াদি গলা ব্যথা
শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও সংক্রমণ ছড়ানো
মারাত্মক পর্য়ায়ে গেলে যা হতে পারে
আপনি যদি টনসিলের প্রদাহকে অবহেলা করেন তা হলে দেখা যাবে টনসিল ফুলে ইনফেকশনের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তা যদি একবার হয় অনেক সময় দেখা যায় যে টনসিল কেটে ফেলতে হয় । আর কেটে ফেললে যা হওয়ার তাই হয়।
শিশুদের টনসিল সমস্যা
শিশুদের টনসিল সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে হয়। অনেক সময় এটি নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে ঘন ঘন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসক শিশুর ওজন, বয়স ও উপসর্গ দেখে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য চিকিৎসা দেন। কোনোভাবেই নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ানো উচিত নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন ?
যদি নিচের উপসর্গগুলো দেখা যায়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
টানা তিন দিনের বেশি জ্বর থাকা
খাওয়া বা পান করা একেবারে কষ্টকর হওয়া
ঘন ঘন টনসিলের প্রদাহ হওয়া
চিকিৎসা
কি চিকিৎসা রয়েছে ? বাসায় তৎক্ষণাৎ কি করবেন তা তো বলে দিলাম । কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ অবশ্যই নিতে পারে । স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া দেখা দিলে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে।
টনসিল একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই গলা ব্যথা বা ফুলে যাওয়া অবহেলা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নিয়মিত গার্গল, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন টনসিলের সমস্যা অনেকটাই প্রতিরোধ করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ FAQ
১. টনসিল কি ছোঁয়াচে রোগ?
👉 টনসিল নিজে ছোঁয়াচে নয়, তবে যেই ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে টনসিল হয় তা ছোঁয়াচে হতে পারে। তাই সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহার্য জিনিসপত্র আলাদা রাখুন।
২. ঘন ঘন টনসিল হলে কি অপারেশন জরুরি?
👉 যদি বছরে ৫-৬ বার টনসিল প্রদাহ হয়, বা খাবার গিলতে খুব কষ্ট হয়, তখন চিকিৎসক অপারেশনের পরামর্শ দেন।
৩. টনসিলের জন্য কী খাওয়া উচিত?
👉 গরম স্যুপ, নরম খাবার যেমন খিচুড়ি, ডাবের পানি, মধু-মিশ্রিত পানি ইত্যাদি উপকারী।
৪. ঠান্ডা পানি বা আইসক্রিম খেলে টনসিল হয়?
👉 সরাসরি না হলেও ঠান্ডা জিনিস গলায় সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে সংক্রমণকে উসকে দিতে পারে। তাই টনসিলের রোগীদের জন্য ঠান্ডা খাবার এড়ানো ভালো।
৫. টনসিল অপারেশনের পর কতদিনে সুস্থ হওয়া যায়?
👉 সাধারণত ৭–১০ দিনের মধ্যে ব্যথা কমে যায় এবং ২ সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়।
৬. প্রাকৃতিকভাবে টনসিল ভালো করা যায় কি?
👉 হালকা সংক্রমণ হলে গার্গল, গরম পানীয় ও বিশ্রামে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়। তবে জ্বর বা
তীব্র ব্যথা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসা নিতে হবে।
৭. টনসিল হলে কণ্ঠস্বর বদলে যায় কেন?
👉 টনসিল ফুলে গেলে গলার ভিতরে স্থান কমে যায়, ফলে শব্দের প্রতিধ্বনি বদলে কণ্ঠ ভারী বা মোটা শোনায়।
