হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে গেল — এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। কি করবেন ভেবে পাননা । পৃথিবীতে এমন অনেক রোগ আছে যাদের পূর্ব লক্ষণ আছে ।আবার এমন রোগ আছে যাদের কোন আগাম লক্ষণ নেই ।
![]() |
| হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া স্ট্রোক বা নার্ভজনিত সমস্যার একটি সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা নিন। |
তেমনি আজকের এই পোষ্টে এমন এক ধরনের রোগ নিয়ে কথা বলব যেটাকে মেডিক্যালের ভাষায় বেলস পালসি (Bell’s Palsy) বলে । এর কোন আগাম লক্ষণ নেই।
রাতে ভালো ভালোয় ঘুমালেন ,সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন মুখ বাঁকা। মুখের ঠোঁট একদিকে ঝুঁকে পড়লে তখন কি অবস্থা হয় তা সেই জানে । এমন অনেক মানুষ আছে যারা এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তারা বুঝেছেন মুখ বেঁকে যাওয়ার পরিণাম । কোথাও গেলে সুন্দর ভাবে কথাও বলতে পারছেন না। কথা বলবেনই কিভাবে ? বেঁকে যাওয়া অংশটুকু তো নাড়াতেই পারছেন না । তখন যে কি অবস্থার সৃষ্টি হয়, আহ !
বেলস পালসি কি ?
আমাদের মুখের পেশীসমুহ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পেশী শক্তি হারিয়ে মুখ বেঁকে যায়। সহজ কথায় বেলস পালসি হলো মুখের প্যারালাইসিস । যার ফলে মুখের একপাশ হঠাৎ করে অবশ হয়ে যায় ।
হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে যাওয়া — এটা কীভাবে হয় ?
যখন হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে যায়, তখন মূলত মুখের একপাশের স্নায়ু (Facial Nerve) কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এই স্নায়ুটি চোখ, ঠোঁট ও মুখের পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একপাশে মুখ হেলে পড়ে, হাসলে বা চোখ বন্ধ করলে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়।
এটি সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা দেয় এবং প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যায়।
মুখ বেঁকে যাওয়ার লক্ষণ কি ?
মুখ বেঁকে যাওয়ার যে লক্ষণ দেখলেই বুঝবেন:
মুখের একপাশ নড়াচড়া করতে না পারা
হাসলে বা চোখ বন্ধ করলে একপাশে বিকৃতি দেখা দেওয়া
চোখ বন্ধ করতে সমস্যা
জিহ্বার স্বাদ কমে যাওয়া
কানে বা গালে ব্যথা অনুভব
কথা বলার সময় অসুবিধা
এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
মুখ বেঁকে যাওয়ার কারণ কি ?
১. বেল’স পালসি (Bell’s Palsy)
সবচেয়ে সাধারণ কারণ। ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ফেসিয়াল নার্ভে প্রদাহ হয়।
২. স্ট্রোক (Stroke)
মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে মুখ বেঁকে যায়।
৩. কানের ইনফেকশন বা ঠান্ডা লাগা
অনেক সময় ঠান্ডা বাতাস বা কানের সংক্রমণও মুখ বেঁকে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
৪. ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ
দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৫. মাথায় আঘাত
স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে গেল এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ঝুঁকিতে আছে কারা ?
কিছু স্বাস্থ্যকর অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক মানুষরই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে । যেমন:
গর্ভবতী মহিলা বিশেষ করে গর্ভকালীন অবস্থায় শেষ তিন মাস,
ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগী,
ভিটামিন সি এর যাদের আছে,
এছাড়াও আরও কিছু আছে ।
মুখ বেঁকে গেলে কি করবেন ?
ডাক্তার দেখান
আপনি যখন এই অবস্থার মুখোমুখি হবেন তখন ডাক্তার ছাড়া উপায় নাই । কেননা এই সময় অর্থাৎ ৭২ ঘন্টার মধ্যে অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নিলে ভালো ফল পাবেন । তাই বলি যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিন । মুখ বাঁকানো কাটিয়ে উঠতে পারবেন ।
ফিজিওথেরাপি
মুখের ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং স্নায়ু পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।
চোখের যত্ন
চোখ বন্ধ না হলে ড্রপ বা প্যাচ ব্যবহার করতে হয়।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স
স্নায়ু শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
হোম রেমেডি
হালকা গরম পানির সেঁক, হালকা ম্যাসাজ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম খুব উপকারী।
নিয়মিত চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার যত্ন
মুখ বেঁকে যাওয়া চিকিৎসা কেবল ওষুধেই শেষ নয়, জীবনধারায় পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক বিশ্রাম নিন
ঠান্ডা বা অতিরিক্ত বাতাস থেকে মুখ ঢেকে রাখুন
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করুন
প্রতিদিন হালকা মুখের ব্যায়াম করুন
প্রচুর পানি পান করুন এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খান ।তরল খাবার খান ।
কিছু ক্ষেত্র ছাড়া বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি ভালো হয় । তবে দীর্ঘমেয়াদীও ভালো হয় তবে সেটা দেরী হয় । তাই অতি সত্বর চিকিৎসা নিন।
মুখ স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগে?
হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে গেল এমন অনেক রোগী ২-৪ সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি দেখতে পান। তবে কেউ কেউ সম্পূর্ণ সেরে উঠতে ২-৩ মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারেন। বেল’স পালসির ক্ষেত্রে প্রায় ৮০% রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান, যদি সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া হয়।
হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে গেল — বিষয়টি ভয় পাওয়ার হলেও সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসায় এটি পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। তাই লক্ষণ দেখলেই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সঠিক যত্ন নিন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসা প্রশ্ন (FAQ)
১. হঠাৎ করেই মুখ বেঁকে গেলে কি স্ট্রোক হতে পারে?
👉 সবসময় নয়। অনেক সময় এটি বেল’স পালসি নামের স্নায়ুজনিত সমস্যাও হতে পারে। তবে স্ট্রোক হলে সাধারণত হাত-পা অবশ হয়ে যায়।
২. বেল’স পালসি কি একবার হলে আবার হতে পারে?
👉 হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে আবারও হতে পারে, বিশেষত যাদের ডায়াবেটিস বা ভাইরাল সংক্রমণ আছে।
৩. মুখ বেঁকে গেলে কি স্থায়ীভাবে বিকৃত থাকে?
👉 না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও ব্যায়ামে ৯০% রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।
৪. মুখ বেঁকে গেলে ঘরোয়া উপায়ে কী করা যায়?
👉 হালকা গরম পানির সেঁক, মুখের ব্যায়াম, ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম উপকারী, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অপরিহার্য।
৫. কখন হাসপাতালে যাওয়া জরুরি?
👉 যদি মুখ বেঁকে যাওয়ার সঙ্গে কথা জড়ানো, হাত-পা অবশ, মাথা ঘোরা বা চেতনা হারানোর মতো উপসর্গ থাকে, তবে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে।
৬. শিশুর মুখ বেঁকে গেলে কী করবেন?
👉 দ্রুত পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন। অনেক সময় এটি জন্মগত বা সংক্রমণজনিত কারণে হয়।
৭. মুখ বেঁকে যাওয়া চিকিৎসা কতদিন চলতে পারে?
👉 সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহ ওষুধ ও ফিজিওথেরাপি চালাতে হয়, তবে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সময় ভিন্ন হতে পারে।
