বর্তমান সময়ে সবচেয়ে পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে অ্যাসিডিটি (Acidity) অন্যতম। আপনি কি অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভুগছেন ? কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না ? অসহ্য , বিরক্তিকর এই সমস্যা পোহাতে হয় আপনাকে ? তাহলে এই লেখাট পড়ুন। সমাধান পাবেন । খাবারে নিয়ম না মানা, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া , খাবার ঠিক মতো হজম না হওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে পাচক রস খাদ্যনালী দিয়ে উপরে উঠে আসে। আর এখান থেকেই পেটে সমস্যা, গলা-বুকে জ্বালাভাব হয়,সেই সাথে প্রচন্ড বুক ব্যথা । অনেকেই একে হালকা মনে করে । এটা হালকা মনে করার কোন বিষয়ই না ।
![]() |
| অ্যাসিডিটির সমস্যায় করণীয় জানলে গ্যাস্ট্রিক ও বুকজ্বালার সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। |
অ্যাসিডিটি কী? (What is Acidity?)
আমাদের পাকস্থলীতে খাবার হজম করার জন্য স্বাভাবিকভাবেই Hydrochloric Acid তৈরি হয়। কিন্তু যখন এই অ্যাসিডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখনই তাকে বলা হয় Acidity বা অতিরিক্ত অম্লতা।
অ্যাসিডিটির লক্ষণগুলো কি কি ? (Symptoms of Acidity)
অ্যাসিডিটির সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
বুক জ্বালা (Heartburn)
গলা পর্যন্ত জ্বালাপোড়া
টক ঢেঁকুর ওঠা
বমি বমি ভাব
পেট ফাঁপা
বুকে চাপ অনুভূত হওয়া
শ্বাসকষ্টের মতো লাগা
রাতের ঘুমে সমস্যা
অ্যাসিডিটি কেন হয়? (Causes of Acidity)
অ্যাসিডিটি হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে । এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো—
১. অনিয়মিত খাবার
আমরা অনেকেই অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকি বা খুব দেরিতে খাই যা অ্যাসিডিটির বড় কারণ।
২. অতিরিক্ত ভাজা ও ঝাল খাবার
Fast food, তেলেভাজা খাবার, মশলাদার খাবার পাকস্থলীতে অ্যাসিড বাড়ায়।
৩. মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
Stress ও Anxiety সরাসরি হজম প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
৪. ধূমপান ও অ্যালকোহল
আপনার কি জানেন ধুমপান ও অ্যালকোহল পাকস্থলীর আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করে ? জেনে হউক বা না জেনে তারপরও অনেকের না হলে হয় না ।তাদের বুঝানোই যায় না ।
৫. অনিয়মিত ঘুম
প্রায় রাতে জেগে থাকা বা কম ঘুম হতে পারে অ্যাসিডিটির কারণ।
৬. অতিরিক্ত চা-কফি
অতিরিক্ত চা- কফি পান অ্যাসিডিটির সমস্যার কারণ। আপনাকে খেতে নিষেধ করা হচ্ছে না ।
এই অ্যাসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আপনার করণীয় কি হতে পারে তাই নিচে আলোচনা করা হলো:
১.আদা
আপনি তখন অ্যাসিডিটির সমস্যা অনুভব করেন তখন এক টুকরো আদা মুখে নিয়ে চুষুন বা এক কাপ পানিতে কয়েক টুকরো আদা দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিয়ে খেতে পারেন। পরে মধুও খেতে পারেন । এই আদার রস পাকস্থলীর অ্যাসিডিটির প্রশমিত করে।
২. মধু
উপরে বলেছি মধুর কথা । আর মধুর উপকারিতা কি তা তো জানেন । এতে ব্যাক্টেরিয়া ও ফাঙ্গাস প্রতিরোধী প্রাকৃতিক উপাদান আছে ,যা হজমে সাহায্য করে ও ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস করে। এটা অ্যাসিডিটির সমস্যা কমায়।
৩.লেবু
লেবু স্বাদ, ঘ্রাণের জন্য খুবই একটা সুস্বাদু খাদ্য। আপনি কি জানেন লেবু অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ করে, শুধু তাই নয় শরীরের পিএইচ’য়ের ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই আপনার উচিত হবে অ্যাসিডিটির সময় লেবুর রস খাওয়া যার ফলে পাকস্থলী থেকে অ্যাসিড দূর হবে ।
৪. ফলমূল
আপেল, কেলা, পেঁপে, আম, জাম, ক্যান্টালূপ ইত্যাদি ফলমূলে থাকা সাইট্রিক এসিড সাহায্যে অ্যাসিডিটির সমস্যা থেকে সামগ্রিকভাবে সুবিধা পেতে পারেন।
৫. প্রোবায়টিক খাবার
দই পরিমিত পরিমাণে, ছানা ইত্যাদি প্রোবায়টিক খাবআর খান ।
৬.পর্যাপ্ত পানি
দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান মানে ৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত। আবার রাতে ঘুমানোর আগে ও সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি পান করুন, ফলে আপনি অ্যাসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
৭.পুদিনা পাতা
যখন আপনার অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দিবে তখন কয়েকটি পুদিনা পাতা চিবিয়ে খেয়ে ফেলুন । দেখবেন পুদিনা পাতা নিমিষেই বুক ও পেট জ্বালাপোড়া, পেট ফাঁপা ও বমি ভাব উপশমে সাহায্য করবে । আপনার স্বস্তি লাগবে ।
৮. খাবার
যাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা তারা একেবারে অনেক খাবার খাবেন না । কয়েকবার ভাগ করে খান । তিন বেলা খাবার তো আছেই । সেই সাথে এরই মাঝে হালকা আবার খেয়ে নিন । অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রণে থাকবে ।
৯. ডাক্তারের পরামর্শ
যদি অ্যাসিটিকের সমস্যা সাধারণ পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান না হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গুরুত্বপূর্ণ কথা
দীর্ঘদিন নিজ ইচ্ছায় অ্যাসিডিটির ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন?
প্রতিদিন অ্যাসিডিটি হলে
বুকের ব্যথা খুব বেশি হলে
বমির সাথে রক্ত এলে
ওজন হঠাৎ কমে গেলে
খাবার গিলতে কষ্ট হলে
অ্যাসিডিটি প্রতিরোধের উপায় (Prevention Tips)
নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খান
ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাবেন
বেশি রাত জেগে থাকা থেকে বিরত থাকুন
মানসিক চাপ কমান
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করুন
অ্যাসিডিটি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ FAQ
১. অ্যাসিডিটি কি হার্টের রোগের মতো ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে?
হ্যাঁ, অনেক সময় অ্যাসিডিটির ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের ব্যথার মতোই অনুভূত হয়।
২. খালি পেটে পানি খেলে কি অ্যাসিডিটি কমে?
হ্যা, তবে খাবার খাওয়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত পানি খাবেন না ।
৩. দিনে কতবার অ্যাসিডিটির ওষুধ খাওয়া নিরাপদ?
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া প্রতিদিন খাওয়া নিরাপদ নয়।
৪. গর্ভাবস্থায় অ্যাসিডিটি কেন বেশি হয়?
হরমোনের পরিবর্তন ও জরায়ুর চাপের কারণে গর্ভাবস্থায় অ্যাসিডিটি বেশি হয়।
৫. অ্যাসিডিটি কি ক্যান্সারের কারণ হতে পারে?
দীর্ঘদিন untreated GERD থাকলে খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
৬. অ্যাসিডিটি থাকলে কি লেবু খাওয়া যাবে?
না, লেবু অ্যাসিডিক হওয়ায় সমস্যা বাড়াতে পারে।
৭. সকালে খালি পেটে চা কি ক্ষতিকর?
হ্যাঁ, এটি অ্যাসিডিটি বাড়িয়ে দিতে পারে।
৮. বাচ্চাদের অ্যাসিডিটি হলে কী করবেন?
ফাস্টফুড বন্ধ করুন, সাদাসিধে খাবার দিন এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।
৯. অ্যাসিডিটি কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?
হ্যাঁ, নিয়মিত জীবনযাপন ও সঠিক খাবারে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
শেষ কথা
অ্যাসিডিটি কোনো ছোট সমস্যা নয়, তবে সঠিক সময়ে সচেতন হলে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন, নিয়মিত খাবার, কম স্ট্রেস ও স্বাস্থ্যকর ডায়েট আপনাকে অ্যাসিডিটির জটিলতা থেকে দূরে রাখতে পারে।
