পায়ের গোড়ালি ফাটা যে রোগের লক্ষণ।

পায়ের গোড়ালি ফাটা একটি অতি পরিচিত সমস্যা। মানুষের শরীরে যেমন ঠোঁট ফাটা একটা সমস্যা তদ্রুপ পায়ের গোড়ালিও । বিশেষত পায়ের গোড়ালি ও ঠোঁট বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফাটতে দেখা যায় । কিন্তু কেন ? আজকে আমরা পায়ের গোড়ালি ফাটা কোন রোগের লক্ষণ কিনা সেটা দেখবো । শুষ্ক মৌসুমে এই সমস্যাটা বেশি হয়। 


Cracked heelsএকজন ব্যক্তির পায়ের ফাটা গোড়ালির ছবি
ফাটা গোড়ালি অনেক সময় ত্বকের শুষ্কতা ছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।





পায়ের গোড়ালি ফাটা শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নানা রোগেরও লক্ষণ হতে পারে। অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক শুষ্কতার সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন ।

                                    


Cracked heel,একজন ব্যক্তি গোড়ালি
নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ফাটা গোড়ালি দ্রুত ভালো হয় ও সংক্রমণ কমে।




পায়ের গোড়ালি ফাটার কারণ কি ?


পায়ের গোড়ালি ফাটার সাধারণ কারণ

 পায়ের গোড়ালি ফাটার কিছু কারণতো অবশ্যই আছে ।যেমনঃ

• অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বক – শীতকালে বা ধুলোবালির কারণে ত্বক আর্দ্রতা হারায়।

• পায়ে চাপ পড়া – দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা শক্ত মেঝেতে খালি পায়ে হাঁটা।

• অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার – নিয়মিত গরম পানিতে গোসল করলে পায়ের আর্দ্রতা নষ্ট হয়।

• ভুল ধরনের জুতা – শক্ত বা খোলা পায়ের জুতা (স্যান্ডেল) গোড়ালি ফাটার ঝুঁকি বাড়ায়।

• পরিচর্যার অভাব – নিয়মিত পরিষ্কার না করা বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করা।







পায়ের গোড়ালি ফাটলে কি কি সমস্যা হয় ? 


কি কি সমস্যা হয় : ব্যথা অনুভব হয় , পা ফুলে যায় ,হাটা চলায় সমস্যা হয় । এমনকি অনেক সময় রক্তও বের হতে পারে।‌





এখন আসি মূল কথায়, পায়ের গোড়ালি ফাটা কোন কোন রোগের লক্ষণ ? এ কথা শুনে বলতেই পারেন এটা কেমন কথা ? হ্যাঁ ভাই আছে বিধায় ডাক্তারগণ বলে থাকেন । কিন্তু আপনি কি জানেন ? মনে হয় অনেকেরই ‌অজানা ।‌পায়ের গোড়ালি ফাটা অনেক সময় ভেতরের স্বাস্থ্য সমস্যারও ইঙ্গিত দিতে পারে। তাহলে আসুন জেনে নেই লক্ষণ গুলো: 



১. পিটরিয়াসিস রুবরা পাইলারিস(PRP)

যাকে সংক্ষেপে পিআরপি‌ বলা হয় । এই রোগটি একটি জেনেটিক রোগ অর্থাৎ জিনবাহিত । প্রচন্ড শীতে শুষ্ক হয়ে ফাটতে শুরু করে। 




২. সোরিয়াসিস (Skin Diseases)

এটি একটি চর্মরোগ ।‌‌ ত্বকের চামড়া ওঠা ও চুলকানি এ রোগের লক্ষণ। 





৩. একজিমা ( Eczema )

একজিমা কে অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস বলা‌ হয় । তবে এটা সোরিয়াসিস এর চেয়ে তাড়াতাড়ি সেড়ে উঠে । অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী। 



৪. হেরিডিটারি পামোপ্লান্টার কেরাটোডার্মা 


 এটি একটি জেনেটিক অর্থাৎ জিনবাহিত রোগ । এর কারণে ত্বকে মোটা আবরণ পড়ে । মোটা স্বাভাবিক এর তুলনায় ৪০%বেশি হয় । 




৫.ভিটামিন ও খনিজের অভাব (Vitamin & Mineral Deficiency)


ভিটামিন A, E, C, ও জিঙ্ক-এর অভাবে ত্বক তার প্রাকৃতিক নমনীয়তা হারায়।


ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে ফাটতে শুরু করে।




৬.হরমোনের ভারসাম্যহীনতা


বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা হরমোন পরিবর্তনের সময় ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, যা গোড়ালি ফাটার কারণ হতে পারে।



৭. পানিশূন্যতা (Dehydration)

শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ত্বক শুকিয়ে যায় এবং গোড়ালি ফেটে যেতে পারে।




৮.ডায়াবেটিস (Diabetes)


ডায়াবেটিসে শরীরের রক্তসঞ্চালন দুর্বল হয়ে যায় এবং ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে।


এর ফলে পায়ের তলা ও গোড়ালির চামড়া মোটা ও ফেটে যেতে পারে।


অনেক সময় ক্ষত হলে তা সহজে শুকায় না এবং সংক্রমণও হতে পারে।


পায়ের গোড়ালি ফাটার প্রতিকার কি ?


গোড়ালি ফাটা যদি শুধুই শুষ্কতার কারণে হয়, তবে কিছু সাধারণ যত্ন নিলেই সমাধান পাওয়া যায়ঃ

• নিয়মিত পা পরিষ্কার করা – দিনে অন্তত একবার হালকা গরম পানিতে ১০ মিনিট ভিজিয়ে নিন।লবণ মেশানো পানিতে প্রতিদিন পা ডুবিয়ে রাখতে পারেন।

• ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার – ভ্যাসলিন, নারিকেল তেল, অলিভ অয়েল বা শিয়া বাটার ব্যবহার করুন।

• পা ঘষে পরিষ্কার – পিউমিস স্টোন বা ফাইল ব্যবহার করে মৃত চামড়া পরিষ্কার করুন।

• সঠিক জুতা পরা – শক্ত জুতার পরিবর্তে নরম কুশনযুক্ত জুতা ব্যবহার করুন।

• পানি পান করা – পর্যাপ্ত পানি পান করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে।

• সুষম খাদ্য গ্রহণ – ভিটামিন এ, সি, ই এবং জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার খান।




কখন ডাক্তার দেখাবেন ?

যদি —

• গোড়ালি ফাটার সাথে সাথে রক্তপাত হয়,

• পায়ে সংক্রমণ বা পুঁজ দেখা দেয়,

• দীর্ঘদিন যত্ন নেওয়ার পরও সারে না,

• ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ক্ষত শুকাতে দেরি হয় —

তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।



পায়ের গোড়ালি ফাটা প্রতিরোধে করণীয় কি ?


প্রতিরোধ : কিছু নিয়ম খেয়াল‌ রাখলে পায়ের গোড়ালি ফাটা এড়ানো য়ায ।‌আর তা হল‌- 




• প্রতিদিন ঘুমানোর আগে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে মোজা পরে ঘুমান।

• গোড়ালি ঘষে পরিষ্কার করার পর তেল বা ক্রিম লাগান।

• শীতকালে পা ঢেকে রাখুন।

• অ্যালোভেরা জেল বা মধু ব্যবহার করলে ত্বক নরম থাকে।

• নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষত যদি ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকে।

•পায়ের মোজা পড়া ।

•গোসলের আগে,ও‌ পরে‌ তেল‌ মাখুন । এতে‌ করে‌ আপনার‌ গোড়ালির‌ ফাটা থেকে এড়াতে পারবেন।‌



পায়ের গোড়ালি ফাটা শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, এটি শরীরের ভেতরের অনেক রোগেরও সংকেত হতে পারে। তাই এটিকে অবহেলা না করে সঠিক যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সর্বোত্তম উপায়।


👉 মনে রাখবেন, “গোড়ালি ফাটা শুধু সৌন্দর্যের নয়, স্বাস্থ্যের বার্তাও বহন করে।”


(প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন) FAQ


প্রশ্ন ১: গোড়ালি ফাটা কি শুধু শীতকালে হয় ?

উত্তর: না, সারা বছরই হতে পারে। তবে শীতে শুষ্কতার কারণে এর মাত্রা বাড়ে।


প্রশ্ন ২: ভ্যাসলিন কি গোড়ালি ফাটার স্থায়ী সমাধান ?

উত্তর: ভ্যাসলিন শুধু আর্দ্রতা ধরে রাখে, তবে মূল কারণ যদি কোনো রোগ হয়, তাহলে ওষুধের প্রয়োজন।

প্রশ্ন ৩: শিশুদের গোড়ালি ফাটা কি চিন্তার কারণ ?

উত্তর: সাধারণত নয়। তবে বারবার হলে ভিটামিনের ঘাটতি বা একজিমার ইঙ্গিত হতে পারে।


প্রশ্ন ৪: পুরুষদের গোড়ালি কেন বেশি ফাটে ?

উত্তর: পুরুষরা সাধারণত পায়ের যত্ন কম নেন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করেন এবং খোলা স্যান্ডেল বেশি ব্যবহার করেন, তাই ফাটার প্রবণতা বেশি।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম