বাবা-মায়ের যে ভুলে সন্তান রাগী ও জেদি হয়ে ওঠে ।

সন্তান বাবা মায়ের একমাত্র অবলম্বন। আর সন্তানকে ঘিরেই যত আশা - আকাঙ্ক্ষা থাকে সব বাবা মায়ের মাঝে । এজন্য প্রয়োজন সন্তানকে ভালোভাবে লালন পালন ।‌‌‌‌‌‌‌

angry stubborn child parenting mistakes.সন্তানকে রাগী ও জেদি করে তুলতে পারে এমন অভিভাবকের ভুল
বাবা-মায়ের কিছু আচরণ ও ভুল সন্তানের স্বভাব, রাগ এবং জেদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।


এ কাজ কি সহজ ? আপনাদের কাছে প্রশ্ন । সব বাবা মা চায় তাদের সন্তান ভবিষ্যতে ভালো‌ থাকুক । তাদের ভবিষ্যৎ এর ভাবনা আপনাদের ভাবতে হয় যখন সন্তান কোল জুরে আসে । 


সন্তানের দেখা- শুনার পাশাপাশি প্রতিটি বাবা মা নিজেদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজে ব্যস্ত থাকেন । আর এ ব্যস্ততার মাঝে সন্তানের যে কোন বিষয় নিয়ে রাগারাগি কিংবা গালাগালি পর্যন্ত দিয়ে থাকেন । 



আবার অনেক সময় সন্তান হঠাৎ রেগে যাচ্ছে, সামান্য কথাতেই চিৎকার করছে, নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলে কান্না বা জেদ করছে—এমন আচরণ অনেক বাবা-মায়ের কাছেই পরিচিত। অনেক সময় সন্তানকে “রাগী”, “জেদি” বা “অবাধ্য” বলে বকাঝকা করা হয়। কিন্তু শিশুর আচরণের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয় না।


একটি শিশুর স্বভাব গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবার ও আশপাশের পরিবেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মায়ের কথা বলার ধরন, শাসন করার পদ্ধতি, সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো এবং তার আবেগকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়—এসব বিষয় শিশুর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।


কখনো কখনো বাবা-মা ভালো উদ্দেশ্যেই এমন কিছু আচরণ করেন, যা শিশুর মধ্যে রাগ বা জেদ বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—প্রতিটি বিষয়ে অতিরিক্ত বকাঝকা করা, সন্তানের কথা না শোনা, অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করা কিংবা কখনো খুব কঠোর আবার কখনো অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া।


আর যদি এমনটা প্রতিনিয়ত চলেই তাহলে বিষয়টা মারাত্মক আকার ধারণ করে ‌ । কিন্তু আবার আর একটা কথা আছে অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট । যতই আহ্লাদ দিবেন ততই মাথায় উঠবে । তাই শাসনের একটা মাপকাঠি থাকা দরকার ।



আবার শিশুর সামনে বাবা-মায়ের ঝগড়া, চিৎকার বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করাও তার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু শুধু উপদেশ শুনেই শেখে না; সে বড়দের আচরণও দেখে এবং অনেক সময় সেটিই অনুকরণ করে।




তবে শিশুর রাগ বা জেদ মানেই যে বাবা-মায়ের ভুল—এমনটা সবসময় বলা ঠিক নয়। তবে হ্যাঁ কিছু ভুলে হতে পারে । শিশুর বয়স, ব্যক্তিত্ব, ঘুম, ক্ষুধা, স্কুলের চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয়ও আচরণে ভূমিকা রাখতে পারে।


তাই সন্তান রাগী বা জেদি হয়ে উঠলে শুধু শাস্তি না দিয়ে প্রথমে তার আচরণের কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। বাবা-মায়ের কিছু সাধারণ ভুল কীভাবে শিশুর রাগ ও জেদ বাড়াতে পারে এবং সেগুলো কীভাবে সামলানো যায়, চলুন জেনে নেওয়া যাক।



১. সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা

শিশুর কাছে তার ছোট সমস্যাটিও অনেক বড় মনে হতে পারে। কিন্তু বাবা-মা যদি বারবার বলেন, “এত ছোট বিষয় নিয়ে কান্না করছ কেন?” বা “চুপ করো, এসব শুনতে চাই না”, তাহলে শিশু ধীরে ধীরে মনে করতে পারে যে তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই।


শিশুর আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া কেন জরুরি?

সন্তান যখন নিজের কথা বলার সুযোগ পায়, তখন সে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে। বিপরীতে তার কথা বারবার বন্ধ করে দিলে হতাশা জমতে পারে এবং কোনো কোনো শিশু সেই হতাশা রাগ, কান্না বা জেদের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে।


অনেক শিশু নিজের সমস্যাটি সুন্দরভাবে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে সে কান্না, চিৎকার বা রাগের মাধ্যমে বোঝাতে চায় যে সে কষ্ট পেয়েছে বা কোনো কিছু চায়।


এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের উচিত শিশুর কথা আগে শোনা। তার সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু তার অনুভূতিটি বুঝতে চেষ্টা করা।


ছোট্ট অভ্যাস

সন্তান কথা বললে কিছুক্ষণ ফোন বা অন্য কাজ পাশে রেখে তার দিকে তাকিয়ে কথা শুনুন।


২. সব সময় বকাঝকা ও চিৎকার করা

শিশুকে ভুলের জন্য বোঝানো এবং প্রতিটি ভুলে চিৎকার করা এক বিষয় নয়। কোনো শিশু বারবার চিৎকার শুনতে থাকলে সে ভয় পেতে পারে, আবার অন্য ক্ষেত্রে একই ধরনের চিৎকারকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।


শাসন আর চিৎকার এক নয়

শিশুকে নিয়ম শেখানোর জন্য সীমা নির্ধারণ করা দরকার। কিন্তু সেই সীমা বোঝাতে অপমানজনক কথা, চিৎকার বা ভয় দেখানো সব সময় কার্যকর পদ্ধতি নয়।


যেমন, শিশু কোনো জিনিস ভেঙে ফেললে “তুমি কিছুই পারো না” বলার পরিবর্তে কী ভুল হয়েছে এবং পরবর্তীতে কীভাবে সাবধান হতে হবে তা বোঝানো যেতে পারে।


একইভাবে শিশুর রাগের সময় বাবা-মাও যদি প্রচণ্ড রেগে যান, তাহলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। শান্ত থাকার চেষ্টা করলে শিশুকেও ধীরে ধীরে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়া যায়।


কী করতে পারেন?

ভুল আচরণ হলে আচরণটিকে নিয়ে কথা বলুন, শিশুর ব্যক্তিত্বকে আক্রমণ করবেন না। “তুমি খারাপ” বলার বদলে “এই কাজটি ঠিক হয়নি”—এভাবে বলা তুলনামূলকভাবে গঠনমূলক।


৩. সন্তানের সঙ্গে অন্য শিশুর তুলনা করা

অনেক সময় বাবা মাকে দেখা যায় সন্তানকে অন্য কারো সাথে তুলনা করতে । শুধু তাই নয় বিরুপ মন্তব্য করতেও শুনা যায় । এই ধরনের কথা সন্তানের মনে আঘাত লাগতে পারে । আপনারা সন্তানের ভালোর জন্য হয়তো বলেন ।এ ধরনের কথার জন্য তার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ।



তুলনা কেন সমস্যা তৈরি করতে পারে?

প্রতিটি শিশুর দক্ষতা, আগ্রহ, শেখার গতি ও ব্যক্তিত্ব আলাদা। বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা করলে শিশু নিজেকে কম যোগ্য মনে করতে পারে।


কখনো আবার সে মনে করতে পারে যে বাবা-মায়ের ভালোবাসা বা প্রশংসা পাওয়ার জন্য তাকে অন্য শিশুর মতো হতে হবে। এতে হতাশা বা ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।


বিশেষ করে ভাই-বোনের মধ্যে তুলনা করলে তাদের সম্পর্কেও প্রতিযোগিতা বা বিরূপতা তৈরি হতে পারে। ফলে শিশুর স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাগী আচরণও দেখা দিতে পারে।


তুলনার পরিবর্তে কী করবেন?

অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে সন্তানের নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করুন। যেমন, “গতবারের চেয়ে এবার তুমি আরও ভালো চেষ্টা করেছ”—এ ধরনের কথা শিশুকে নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগী করতে পারে।


৪. কখনো অতিরিক্ত কঠোর, আবার কখনো অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া

শিশুর জন্য নিয়ম থাকা দরকার। কিন্তু নিয়ম যদি প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়, তাহলে শিশু বুঝতে পারে না কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়।


অসঙ্গত শাসনের প্রভাব

একদিন কোনো কাজের জন্য শিশুকে কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হলো, আবার অন্যদিন একই কাজের জন্য তাকে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হলো—এভাবে চললে শিশুর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।


আবার বাবা-মায়ের একজন কোনো বিষয়ে নিষেধ করলেন, অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি দিয়ে দিলেন—এমন পরিস্থিতিও শিশু কি করবে ? সে তো বুঝতেছে না । তার পক্ষে যেটা যাবে সেটা গ্রহণ করতে পারে । এ জন্য শাসনের একটা মাপকাঠি থাকতে হয় ।


পরিবারে পরিষ্কার নিয়ম তৈরি করুন

বাড়িতে কয়েকটি সহজ ও বাস্তবসম্মত নিয়ম নির্ধারণ করুন। বাবা-মা দুজনেই যতটা সম্ভব একই নিয়ম অনুসরণ করলে শিশুর জন্য বিষয়টি বোঝা সহজ হয়।


৫. সন্তানের প্রতিটি চাহিদা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করা

সন্তানকে ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মায়ের ইচ্ছা। কিন্তু ভালোবাসার কারণে শিশুর প্রতিটি চাহিদা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করা সব সময় উপকারী নাও হতে পারে।


“না” শুনতেও শেখা দরকার

শিশু যদি সব সময় নিজের ইচ্ছামতো কিছু পেয়ে যায়, তাহলে প্রত্যাখ্যান বা অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতা কমে যেতে পারে। পরবর্তীতে কোনো চাহিদা পূরণ না হলে সে বেশি রাগ বা জেদ দেখাতে পারে।


এ কারণে শিশুকে সব সময় বঞ্চিত করতে হবে এমন নয়। বরং কোন জিনিস এখন প্রয়োজন, কোনটি পরে পাওয়া যাবে এবং কোনটি একেবারেই প্রয়োজনীয় নয়—এসবের পার্থক্য শেখানো যেতে পারে।


শিশু কোনো কিছু চাইলে সরাসরি “না” বলার পাশাপাশি কারণটিও সংক্ষেপে বোঝানো যেতে পারে। এতে সে ধীরে ধীরে সীমা ও অপেক্ষার বিষয়টি বুঝতে শেখে।


ধৈর্য শেখানোর ছোট উপায়

খেলনা, বা শিশুর পছন্দের জিনিস চাইলে প্রতিবার সঙ্গে সঙ্গে না দিয়ে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করার অভ্যাস করানো যেতে পারে। বয়স অনুযায়ী ধীরে ধীরে এই অপেক্ষার সময় বাড়ানো যায়। ধৈর্য কি সেটা শিশুকে একটু একটু করে বোঝানো দরকার


৬. শিশুর সামনে বাবা-মায়ের চিৎকার বা ঝগড়া করা

শিশুর সামনে বাবা-মায়ের পারস্পরিক আচরণ তার শেখার অন্যতম উৎস। বাড়িতে যদি নিয়মিত চিৎকার, অপমান বা উত্তেজনাপূর্ণ কথাবার্তা হয়, শিশু সেই আচরণকে স্বাভাবিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে দেখতে পারে।


শিশু ,তার সামনে যা দেখে তা করার চেষ্টা করে , অর্থাৎ তা দেখে শিখে।শিশু যখন দেখে কোনো মতের অমিল হলেই একজন অন্যজনের ওপর চিৎকার করছেন,কথা কাটাকাটি হচ্ছে, তখন সে নিজের মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। এতে করে তার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ।


তাই সন্তানকে “রাগ করবে না” বলার পাশাপাশি বাবা-মায়ের নিজেদের রাগ সামলানোর দিকেও নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।


মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্ভব হলে শিশুর সামনে অপমানজনক ভাষা বা অতিরিক্ত উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে শান্তভাবে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা ভালো।


বাবা-মায়ের আচরণই শিশুর কাছে উদাহরণ

হ্যাঁ, শিশুর জন্য বাবা মাই উদাহরণ । রাগের সময় যদি নিজেরা শান্ত থাকতে পারেন আর তা নিয়ে পরবর্তীতে কথা বলে সমাধান করেন তা দেখে শিশু শিখবে যে রাগের সময় নিজেকে কিভাবে শান্ত রাখার যায় ।



৭. অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিনের সুযোগ দেওয়া

মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশন শিশুর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ, পারিবারিক যোগাযোগ ও অন্যান্য অভ্যাসের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।


স্ক্রিনকে যেন রাগ থামানোর একমাত্র উপায় না বানানো হয়

শিশু কান্না বা রাগ করলেই মোবাইল দিয়ে শান্ত করার অভ্যাস তৈরি হলে সে ধীরে ধীরে শিখে যেতে পারে যে রাগ বা কান্নার পর স্ক্রিন পাওয়া যায়।


ফলে মোবাইল বন্ধ করতে বললে আবার নতুন করে কান্না বা জেদ দেখা দিতে পারে।


তবে আমি বলব যতটা সম্ভব মোবাইল ,টিভি থেকে দূরে রাখবেন । বিশেষ করে সন্তানের সামনে মোবাইল ব্যবহার করবেন না । যদি কথা বলানোর প্রয়োজন হয় তখন দিতে পারেন সামান্য সময়ের জন্য ,ব্যাস।


৮. সন্তানের ভালো কাজের প্রশংসা না করা

অনেক বাবা-মা শিশুর ভুল দেখলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান, কিন্তু ভালো আচরণ করলে সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। এতে শিশু বুঝতে পারে না কোন আচরণটি বাবা-মায়ের কাছে প্রশংসনীয়।


ভালো আচরণকে স্বীকৃতি দিন

সন্তান নিজে থেকে খেলনা গুছিয়ে রাখলে, ছোট ভাই-বোনকে সাহায্য করলে, রাগের সময় শান্ত থাকার চেষ্টা করলে বা নিজের ভুল স্বীকার করলে তাকে নির্দিষ্টভাবে প্রশংসা করা যেতে পারে।


“ভালো ছেলে” বলার পাশাপাশি কী ভালো করেছে সেটিও বলা ভালো। যেমন—“তুমি রাগ করেও চিৎকার না করে আমাকে বলেছ, এটা ভালো হয়েছে।”


এ ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া শিশুকে বুঝতে সাহায্য করে কোন আচরণটি গ্রহণযোগ্য। তবে প্রশংসাও যেন অতিরঞ্জিত বা প্রতিটি ছোট কাজের বিনিময়ে পুরস্কারনির্ভর না হয়।


৯. শিশুকে সময় না দেওয়া ও আবেগগত দূরত্ব তৈরি করা

শিশুর জন্য খাবার, পোশাক, পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানোও গুরুত্বপূর্ণ।


শুধু একই বাড়িতে থাকা মানেই সময় দেওয়া নয়

বাবা-মা সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, তার দিনের অভিজ্ঞতা শোনা বা একসঙ্গে কোনো খেলায় অংশ নেওয়া যেতে পারে।


শিশু যদি মনে করে তার কথা শোনার মতো কেউ নেই, তাহলে সে মনোযোগ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন আচরণ করতে পারে। সব ক্ষেত্রে রাগ বা জেদ এর কারণ হবে এমন নয়, তবে শিশুর আচরণ বোঝার সময় এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।


প্রতিদিনের ছোট সময়ই গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিদিন দীর্ঘ সময় দেওয়া সম্ভব না হলেও নির্দিষ্ট কিছু সময় সন্তানকে দেওয়া যেতে পারে। সেই সময় ফোন বা অন্যান্য ব্যস্ততা থেকে দূরে থেকে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করুন।


১০. শিশুকে “রাগী” বা “জেদি” বলে বারবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া

একটি শিশু ভুল আচরণ করতে পারে। কিন্তু সেই আচরণকে তার স্থায়ী পরিচয় বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়।


পরিচয়ের বদলে আচরণ নিয়ে কথা বলুন

“তুমি খুব জেদি” বলার পরিবর্তে “তুমি এখন এই বিষয়টি নিয়ে জেদ করছ”—এভাবে বলা শিশুকে বুঝতে সাহায্য করে যে আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব।


একইভাবে “তুমি সব সময় রাগ করো” বলার বদলে “তুমি এখন রেগে আছ, আগে শান্ত হই”—এভাবে পরিস্থিতি সামলানো যেতে পারে।


শিশুর সামনে অন্যদের কাছেও তাকে বারবার রাগী বা জেদি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এড়ানো ভালো। কারণ শিশু ধীরে ধীরে সেই পরিচয়কে নিজের সম্পর্কে ধারণার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।


লক্ষ্য হওয়া উচিত আচরণ শেখানো

শিশুকে বোঝাতে হবে যে রাগ একটি আবেগ, কিন্তু রাগ প্রকাশের সব ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। অনুভূতি প্রকাশ করা যাবে, তবে অন্যকে আঘাত করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করা গ্রহণযোগ্য নয়।




কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার?

শিশুর রাগ বা জেদ কখনো কখনো স্বাভাবিক বিকাশের অংশ হতে পারে। কিন্তু আচরণ যদি দীর্ঘদিন ধরে খুব তীব্র থাকে, বাড়ি ও স্কুলের স্বাভাবিক জীবনকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে, অথবা শিশু নিজেকে কিংবা অন্যকে আঘাত করার মতো আচরণ করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।


শুধু “দুষ্টুমি” ভেবে উপেক্ষা করবেন না

শিশুর আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে তার ঘুম, স্কুল, বন্ধু, পারিবারিক পরিবেশ বা সাম্প্রতিক কোনো পরিবর্তনের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা উচিত।


প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞ, শিশুমনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। বিশেষ করে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে গেলে বা বাবা-মায়ের চেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ।‌


শেষ কথা

সন্তান রাগী বা জেদি হয়ে উঠলে তাকে শুধু দোষারোপ না করে তার আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। বাবা-মায়ের প্রতিটি আচরণ শিশুর স্বভাবে একইভাবে প্রভাব ফেলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে পরিবারের যোগাযোগের ধরন, শাসন, ভালোবাসা, সীমা ও উদাহরণ শিশুর শেখার পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


চিৎকারের পরিবর্তে শান্তভাবে কথা বলা, তুলনা না করা, সন্তানের কথা শোনা, পরিষ্কার নিয়ম তৈরি করা এবং ভালো আচরণকে স্বীকৃতি দেওয়া—এসব অভ্যাস পরিবারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাগ একটি স্বাভাবিক আবেগ; কিন্তু রাগ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, 

সেটি শিশুকে শেখানো দরকার। তাই সন্তানকে “রাগী” বা “জেদি” বলে চিহ্নিত করার পরিবর্তে তাকে নিজের অনুভূতি বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা শেখানোর দিকে মনোযোগ দিন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম