পরিবেশ

আমাদের চারপাশে যা কিছু জীবনের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে পরিবেশ। বাতাস, পানি, মাটি, গাছপালা, নদী-নালা, পাহাড়, সমুদ্র, প্রাণী ও মানুষ—সবকিছু মিলেই পরিবেশের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষ পরিবেশের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে। আমরা শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস, পান করার জন্য পানি এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য মাটির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ আজ নানা সমস্যার মুখোমুখি। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ, শব্দদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। পরিবেশ রক্ষা তাই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। একজন সাধারণ মানুষও তার দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন। ছোট ছোট সচেতন উদ্যোগ একত্রিত হলে একটি বড় পরিবর্তন সম্ভব। পরিবেশ কী? সহজভাবে বলতে গেলে, জীবজগতকে ঘিরে থাকা জীবিত ও জড় সব উপাদানের সমষ্টিই পরিবেশ। পরিবেশের মধ্যে রয়েছে বায়ু, পানি, মাটি, আলো, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ। পরিবেশের প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। মানুষ ও প্রাণী অক্সিজেন গ্রহণ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। আবার গাছপালা ও অন্যান্য জীব খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে একে অপরের ওপর নির্ভর করে। এই পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে পরিবেশের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব অন্য অংশেও পড়তে পারে। পরিবেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ? মানুষের অস্তিত্বই পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমরা প্রতিদিন পরিবেশ থেকে নানা ধরনের সুবিধা পাই। প্রথমত, পরিবেশ আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে। গাছপালা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের ভারসাম্য বজায় থাকে। দ্বিতীয়ত, পানি আমাদের জীবনের অপরিহার্য উপাদান। পান করা, রান্না, কৃষিকাজ, শিল্প ও দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে আমরা পানির ওপর নির্ভর করি। তৃতীয়ত, খাদ্যের বড় অংশ সরাসরি প্রকৃতি থেকে আসে। কৃষিজমি, নদী, সমুদ্র, বন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের খাদ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া পরিবেশ মানুষের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও যুক্ত। কৃষি, মৎস্য, বন, পর্যটনসহ বহু খাত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ পরিবেশ দূষণের পেছনে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে কয়েকটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১. বন উজাড় গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বসতি, রাস্তা, শিল্পকারখানা ও কৃষিজমি তৈরির জন্য অনেক জায়গায় নির্বিচারে গাছ কাটা হয়। বন কমে গেলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক প্রাণী তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারায়। একই সঙ্গে মাটির ক্ষয় বাড়তে পারে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্যও পরিবর্তিত হতে পারে। ২. যানবাহনের ধোঁয়া শহরাঞ্চলে যানবাহন বায়ুদূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিভিন্ন গ্যাস ও ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। অতিরিক্ত যানজট ও পুরোনো বা অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ করা যানবাহনের কারণে দূষণ আরও বাড়তে পারে। ৩. শিল্পকারখানার বর্জ্য কারখানার ধোঁয়া, রাসায়নিক পদার্থ ও তরল বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে বায়ু, পানি ও মাটি দূষিত হতে পারে। শিল্পবর্জ্য নদী বা জলাশয়ে ফেলা হলে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। ৪. প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত প্রচলিত। কিন্তু একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক প্লাস্টিক সহজে প্রাকৃতিকভাবে ভেঙে যায় না এবং দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে যায়। নদী, সমুদ্র ও মাটিতে প্লাস্টিক জমে গেলে প্রাণীরা তা খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে বা এতে আটকে যেতে পারে। ৫. অপরিকল্পিত নগরায়ণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহর সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনাহীনভাবে ভবন, রাস্তা ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরি হলে গাছপালা ও জলাধার কমে যেতে পারে। এর ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হওয়া, জলাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত তাপের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বায়ুদূষণ ও এর প্রভাব বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস, ধোঁয়া, ধুলিকণা বা অন্যান্য দূষক অতিরিক্ত পরিমাণে উপস্থিত হলে বায়ুদূষণ ঘটে। যানবাহন, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ, আবর্জনা পোড়ানো এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বায়ুদূষণ হতে পারে। বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। বায়ুদূষণ কমাতে গণপরিবহন ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমানো, আবর্জনা না পোড়ানো এবং বেশি গাছ লাগানোর মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। পানিদূষণ নদী, খাল, পুকুর, হ্রদ বা ভূগর্ভস্থ পানিতে ক্ষতিকর পদার্থ মিশে গেলে পানিদূষণ হতে পারে। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক বর্জ্য পানিদূষণের অন্যতম কারণ। দূষিত পানি শুধু মানুষের জন্য নয়, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর। পানিদূষণের কারণে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই নদী ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি। মাটিদূষণ মাটিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ জমা হলে মাটিদূষণ হতে পারে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও মাটির গুণমানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মাটি সুস্থ না থাকলে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে সঠিক কৃষিপদ্ধতি অনুসরণ, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এড়ানো এবং বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা দরকার। শব্দদূষণ পরিবেশ দূষণ বলতে শুধু বাতাস, পানি বা মাটির দূষণ বোঝায় না। অতিরিক্ত ও বিরক্তিকর শব্দও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। হর্ন, নির্মাণকাজ, উচ্চ শব্দের মাইক, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি শব্দদূষণের উৎস হতে পারে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের ঘুম, মনোযোগ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা এবং আবাসিক এলাকার আশপাশে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা শব্দদূষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার বিভিন্ন ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি প্রধান কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় ও বিভিন্ন শিল্পকার্যক্রম এতে ভূমিকা রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একদিকে ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে, অন্যদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে। Tags Health Facebook Twitter You might like সবগুলো দেখুন  আমাদের চারপাশে যা কিছু জীবনের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে পরিবেশ। বাতাস, পানি, মাটি, গাছপালা, নদী-নালা, পাহাড়, সমুদ্র, প্রাণী ও মানুষ—সবকিছু মিলেই পরিবেশের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষ পরিবেশের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে। আমরা শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস, পান করার জন্য পানি এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য মাটির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ আজ নানা সমস্যার মুখোমুখি। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ, শব্দদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। পরিবেশ রক্ষা তাই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। একজন সাধারণ মানুষও তার দৈনন্দিন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম